প্রায় আড়াই বছর হলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে ভোক্তা পর্যায়ে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপি গ্যাস) দাম নির্ধারণ করে আসছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কখনো দেশের সব ভোক্তা তাদের নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস কিনতে পেরেছেন বলে জানা যায় না। এক বছর আগে বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলাম। তখন যে অবস্থা ছিল এখনো ঠিক তা-ই আছে। গ্রাহক প্রতারিত হয়েই চলেছেন। এর পেছনে দাম নির্ধারণে ত্রুটি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী ডিলার এবং ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কারসাজি। অবশ্য তাঁদের সবাই যে কারসাজি করেই বেশি দাম নেন, সে কথাও বলা মুশকিল। কিছু কারণও আছে। কিন্তু এর অবসান হওয়া দরকার। অনন্তকাল ধরে দেশের কোটি কোটি গ্রাহক একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কিনে প্রতারিত হতেই থাকবেন, এটা বোধ হয় মগের মুল্লুকেও সম্ভব নয়। দেশে এলপি গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয় দুই দশকের বেশি সময় আগে। তখন এটি কেবল পাইপলাইন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন এলপি গ্যাস দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক জ্বালানি পণ্য। বর্তমানে বাণিজ্যিক, যাতায়াত-পরিবহন, এমনকি শিল্পের জ্বালানি হিসেবেও এর ব্যবহার হচ্ছে এবং ক্রমাগতভাবে এর চাহিদা বাড়ছে। সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ফলে দৈনন্দিন জীবনে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এলপি গ্যাস ইতিমধ্যে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় উঠে এসেছে। ১৪-১৫ বছরে দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা ও ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৩৩ গুণ। সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা ছিল ৪৫ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা প্রায় ১৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার বৃদ্ধি-সংক্রান্ত জাইকার একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা ৩০ লাখ টন এবং ২০৪১ সালে ৬০ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। এলপি গ্যাসের দাম এবং পরিমাপ নিয়ে শুরু থেকেই বিস্তর বিশৃঙ্খলা ও অভিযোগ ছিল। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এর একাধিক দাম থাকত এবং সেই দামের মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান দেখা যেত। কখনো চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছু কম থাকলেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হতো। তখনকার এসব কারসাজি ছিল প্রধানত ডিস্ট্রিবিউটর-ডিলার পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের। ফলে ভোক্তারা সব সময় অস্বস্তিতে থাকতেন। এই বিশৃঙ্খলা অবসানের জন্য কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বিইআরসিকে এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের এখতিয়ার দেওয়ার জন্য হাইকোর্টে একটি মামলা করে। ওই মামলার রায়ে হাইকোর্ট বিইআরসিকে দাম নির্ধারণের এখতিয়ার দেন। এরপর বিইআরসি গণশুনানিসহ যাবতীয় আইনি-প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের দাম ঘোষণা করে। এর পর থেকে প্রতি মাসেই বিইআরসি কাজটি করে আসছে। প্রতি মাসে দাম ঘোষণার কারণ হলো, এলপি গ্যাস মূলত একটি আমদানিপণ্য। এর প্রায় ৯৯ শতাংশ সৌদি অ্যারামকো নামে সৌদি আরবের একটি কোম্পানির কাছ থেকে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা আমদানি করে থাকেন। তারপর সিলিন্ডারজাত করে তাঁরাই বাজারজাত করেন। সৌদি অ্যারামকো প্রতি মাসের ১ তারিখে ওই মাসের জন্য এলপি গ্যাসের দুটি উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের দাম ঘোষণা করে। মূলত মৌসুমি কারণে প্রতি টন প্রোপেন-বিউটেনের দাম ২০০ ডলার পর্যন্তও কম-বেশি হতে দেখা যায়। তাই সৌদি অ্যারামকোর দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ব্যবসায়ীদের মুনাফা প্রভৃতি হিসাব করে দেশেও প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু বিইআরসির নির্ধারিত দাম কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। প্রথমবার নির্ধারিত দাম নিয়ে আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সকল পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। ওই সময় ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডারে আমদানিকারকদের মুনাফা থেকে পরিবহন ব্যয় এবং ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরদের কমিশন পর্যন্ত মোট কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫৯ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, নির্ধারিত কমিশনে তাঁদের অনেক ব্যয় ধরা হয়নি এবং কোনো কোনো ব্যয় কম ধরা হয়েছে। তাই তাঁরা বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস সরবরাহ ও বিক্রি করতে অসমর্থ। বিইআরসি তখন তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মোবাইল কোর্ট নামিয়ে তাঁদের নির্ধারিত দাম কার্যকর করার চেষ্টা করে। তখন ব্যবসায়ীরা এলপি গ্যাস বিক্রি করবেন না—এমন একটি অবস্থান নেন। ফলে বিইআরসি ওই চেষ্টা বন্ধ করে এবং ছয় মাসের মাথায় কমিশন পুনর্নির্ধারণ করে ৪৪১ টাকায় উন্নীত করে। এই সিদ্ধান্ত ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার ছাড়া সব ব্যবসায়ী মেনে নেন। ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের হিসাব অনুযায়ী পরিবহন ও কমিশন বাবদ তাঁদের প্রাপ্য হয় ১২০ টাকা। কিন্তু বিইআরসি নির্ধারণ করে ৭২ টাকা। এ নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ ছিল। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির ক্ষেত্রে তাঁরা সিলিন্ডারপ্রতি ১০-২০ টাকা বাড়িয়ে নিতেন। ভোক্তারাও তা মেনে নিতেন। এভাবেই চলছিল। তবে এখন যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে তা একটু জটিল। প্রথমত, সমস্যা হচ্ছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য প্রয়োজনীয় ডলার না পাওয়া। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে তেল-এলএনজির দাম আকাশচুম্বী হলেও এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ এটি গ্যাসের উপজাত দ্রব্য। কিন্তু ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং এলসি খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত দামে ডলার না পাওয়ায় আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্বিতীয় সমস্যা হলো, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপে জ্বালানি পণ্যবাহী জাহাজের চাহিদা বেড়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ডলারের দাম বাড়তি সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে আমদানিকারকেরা সমস্যায় পড়েছেন। তৃতীয় সমস্যা হলো, জ্বালানি তেলের, বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের মধ্যে এলপি গ্যাসের পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। এলপি গ্যাস একটি অতি দাহ্য পদার্থ হওয়ায় তা সিএনজি কিংবা অটোগ্যাসচালিত কোনো যানবাহনে পরিবহন করা হয় না। ফলে ডিজেলচালিত ট্রাক, রোড ট্যাংকার এবং ছোট ছোট জাহাজে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে এলপি গ্যাস পরিবহন করা হয়। ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয়ের আগের সব হিসাব-নিকাশ বাতিলের খাতায় চলে গেছে। আমদানিকারকেরা এই সমস্যাগুলো তুলে ধরার পর জাতীয় ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তরও তাঁদের সঙ্গে একটি সভা করেছে। সেই সভায় ট্যারিফ কমিশনের একজন সদস্যও ছিলেন। আমদানিকারকদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর তাঁরা কোনো দ্বিমত করেননি। কিন্তু ডলার সংকটের সমাধান তাঁদের কারও আওতার মধ্যে নেই। তা ছাড়া, বিইআরসি ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছে, জাহাজভাড়াসহ এলপি গ্যাস আমদানির ইনভয়েস (প্রকৃত মূল্যের রসিদ) দাখিল করতে। সেটা সব ব্যবসায়ী করছেন না। কেউ কেউ দাখিল করলেও প্রকৃত ইনভয়েসের সঙ্গে দাখিল করা ইনভয়েসের ব্যবধান দেখা গেছে বলে বিইআরসি সূত্র জানায়। প্রসঙ্গত, এলপি গ্যাসের প্রায় ৯৯ শতাংশ আমদানি করা হয়। বর্তমানে ২৮টির বেশি কোম্পানি এই ব্যবসায় সক্রিয় রয়েছে। এই ব্যবসায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি খাতের একটি মাত্র কোম্পানি (এলপিজিসিএল বা এলপি গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড) দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন করা গ্যাসের উপজাত হিসেবে যে কনডেনসেট পাওয়া যায় তা কৈলাসটিলায় নিজস্ব ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করে এলপি গ্যাস উৎপাদন ও বাজারজাত করে। দেশে এলপি গ্যাসের বর্তমান বাজারে তাদের অংশীদারত্ব ১ শতাংশেরও কম। বেসরকারি খাতের আরও ২৮টি কোম্পানি এলপি গ্যাস আমদানি ও বাজারজাত করার জন্য সরকারি লাইসেন্স নিয়েছে। অরুণ কর্মকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক  
"/>

এলপি গ্যাসের দামে গ্রাহক প্রতারিত

মতামত, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, 68 বার পড়া হয়েছে,

প্রায় আড়াই বছর হলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে ভোক্তা পর্যায়ে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপি গ্যাস) দাম নির্ধারণ করে আসছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কখনো দেশের সব ভোক্তা তাদের নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস কিনতে পেরেছেন বলে জানা যায় না। এক বছর আগে বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলাম। তখন যে অবস্থা ছিল এখনো ঠিক তা-ই আছে। গ্রাহক প্রতারিত হয়েই চলেছেন। এর পেছনে দাম নির্ধারণে ত্রুটি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী ডিলার এবং ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কারসাজি। অবশ্য তাঁদের সবাই যে কারসাজি করেই বেশি দাম নেন, সে কথাও বলা মুশকিল। কিছু কারণও আছে। কিন্তু এর অবসান হওয়া দরকার। অনন্তকাল ধরে দেশের কোটি কোটি গ্রাহক একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কিনে প্রতারিত হতেই থাকবেন, এটা বোধ হয় মগের মুল্লুকেও সম্ভব নয়।

দেশে এলপি গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয় দুই দশকের বেশি সময় আগে। তখন এটি কেবল পাইপলাইন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন এলপি গ্যাস দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক জ্বালানি পণ্য। বর্তমানে বাণিজ্যিক, যাতায়াত-পরিবহন, এমনকি শিল্পের জ্বালানি হিসেবেও এর ব্যবহার হচ্ছে এবং ক্রমাগতভাবে এর চাহিদা বাড়ছে। সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ফলে দৈনন্দিন জীবনে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এলপি গ্যাস ইতিমধ্যে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় উঠে এসেছে।

১৪-১৫ বছরে দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা ও ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৩৩ গুণ। সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা ছিল ৪৫ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা প্রায় ১৫ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার বৃদ্ধি-সংক্রান্ত জাইকার একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা ৩০ লাখ
টন এবং ২০৪১ সালে ৬০ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে।

এলপি গ্যাসের দাম এবং পরিমাপ নিয়ে শুরু থেকেই বিস্তর বিশৃঙ্খলা ও অভিযোগ ছিল। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এর একাধিক দাম থাকত এবং সেই দামের মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান দেখা যেত। কখনো চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কিছু কম থাকলেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হতো। তখনকার এসব কারসাজি ছিল প্রধানত ডিস্ট্রিবিউটর-ডিলার পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের। ফলে ভোক্তারা সব সময় অস্বস্তিতে থাকতেন।

এই বিশৃঙ্খলা অবসানের জন্য কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বিইআরসিকে এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের এখতিয়ার দেওয়ার জন্য হাইকোর্টে একটি মামলা করে। ওই মামলার রায়ে হাইকোর্ট বিইআরসিকে দাম নির্ধারণের এখতিয়ার দেন। এরপর বিইআরসি গণশুনানিসহ যাবতীয় আইনি-প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল প্রথম ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের দাম ঘোষণা করে। এর পর থেকে প্রতি মাসেই বিইআরসি কাজটি করে আসছে।

প্রতি মাসে দাম ঘোষণার কারণ হলো, এলপি গ্যাস মূলত একটি আমদানিপণ্য। এর প্রায় ৯৯ শতাংশ সৌদি অ্যারামকো নামে সৌদি আরবের একটি কোম্পানির কাছ থেকে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা আমদানি করে থাকেন। তারপর সিলিন্ডারজাত করে তাঁরাই বাজারজাত করেন। সৌদি অ্যারামকো প্রতি মাসের ১ তারিখে ওই মাসের জন্য এলপি গ্যাসের দুটি উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের দাম ঘোষণা করে। মূলত মৌসুমি কারণে প্রতি টন প্রোপেন-বিউটেনের দাম ২০০ ডলার পর্যন্তও কম-বেশি হতে দেখা যায়। তাই সৌদি অ্যারামকোর দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ব্যবসায়ীদের মুনাফা প্রভৃতি হিসাব করে দেশেও প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়।

কিন্তু বিইআরসির নির্ধারিত দাম কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। প্রথমবার নির্ধারিত দাম নিয়ে আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সকল পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। ওই সময় ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডারে আমদানিকারকদের মুনাফা থেকে পরিবহন ব্যয় এবং ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরদের কমিশন পর্যন্ত মোট কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫৯ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, নির্ধারিত কমিশনে তাঁদের অনেক ব্যয় ধরা হয়নি এবং কোনো কোনো ব্যয় কম ধরা হয়েছে। তাই তাঁরা বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস সরবরাহ ও বিক্রি করতে অসমর্থ।

বিইআরসি তখন তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মোবাইল কোর্ট নামিয়ে তাঁদের নির্ধারিত দাম কার্যকর করার চেষ্টা করে। তখন ব্যবসায়ীরা এলপি গ্যাস বিক্রি করবেন না—এমন একটি অবস্থান নেন। ফলে বিইআরসি ওই চেষ্টা বন্ধ করে এবং ছয় মাসের মাথায় কমিশন পুনর্নির্ধারণ করে ৪৪১ টাকায় উন্নীত করে। এই সিদ্ধান্ত ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার ছাড়া সব ব্যবসায়ী মেনে নেন। ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের হিসাব অনুযায়ী পরিবহন ও কমিশন বাবদ তাঁদের প্রাপ্য হয় ১২০ টাকা। কিন্তু বিইআরসি নির্ধারণ করে ৭২ টাকা। এ নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ ছিল। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির ক্ষেত্রে তাঁরা সিলিন্ডারপ্রতি ১০-২০ টাকা বাড়িয়ে নিতেন। ভোক্তারাও তা মেনে নিতেন। এভাবেই চলছিল।

তবে এখন যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে তা একটু জটিল। প্রথমত, সমস্যা হচ্ছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য প্রয়োজনীয় ডলার না পাওয়া। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে তেল-এলএনজির দাম আকাশচুম্বী হলেও এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ এটি গ্যাসের উপজাত দ্রব্য। কিন্তু ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং এলসি খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত দামে ডলার না পাওয়ায় আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপে জ্বালানি পণ্যবাহী জাহাজের চাহিদা বেড়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ডলারের দাম বাড়তি সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে আমদানিকারকেরা সমস্যায় পড়েছেন।

তৃতীয় সমস্যা হলো, জ্বালানি তেলের, বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের মধ্যে এলপি গ্যাসের পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। এলপি গ্যাস একটি অতি দাহ্য পদার্থ হওয়ায় তা সিএনজি কিংবা অটোগ্যাসচালিত কোনো যানবাহনে পরিবহন করা হয় না। ফলে ডিজেলচালিত ট্রাক, রোড ট্যাংকার এবং ছোট ছোট জাহাজে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে এলপি গ্যাস পরিবহন করা হয়। ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয়ের আগের সব হিসাব-নিকাশ বাতিলের খাতায় চলে গেছে।

আমদানিকারকেরা এই সমস্যাগুলো তুলে ধরার পর জাতীয় ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তরও তাঁদের সঙ্গে একটি সভা করেছে। সেই সভায় ট্যারিফ কমিশনের একজন সদস্যও ছিলেন। আমদানিকারকদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর তাঁরা কোনো দ্বিমত করেননি। কিন্তু ডলার সংকটের সমাধান তাঁদের কারও আওতার মধ্যে নেই। তা ছাড়া, বিইআরসি ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছে, জাহাজভাড়াসহ এলপি গ্যাস আমদানির ইনভয়েস (প্রকৃত মূল্যের রসিদ) দাখিল করতে। সেটা সব ব্যবসায়ী করছেন না। কেউ কেউ দাখিল করলেও প্রকৃত ইনভয়েসের সঙ্গে দাখিল করা ইনভয়েসের ব্যবধান দেখা গেছে বলে বিইআরসি সূত্র জানায়।

প্রসঙ্গত, এলপি গ্যাসের প্রায় ৯৯ শতাংশ আমদানি করা হয়। বর্তমানে ২৮টির বেশি কোম্পানি এই ব্যবসায় সক্রিয় রয়েছে। এই ব্যবসায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি খাতের একটি মাত্র কোম্পানি (এলপিজিসিএল বা এলপি গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড) দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলন করা গ্যাসের উপজাত হিসেবে যে কনডেনসেট পাওয়া যায় তা কৈলাসটিলায় নিজস্ব ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করে এলপি গ্যাস উৎপাদন ও বাজারজাত করে। দেশে এলপি গ্যাসের বর্তমান বাজারে তাদের অংশীদারত্ব ১ শতাংশেরও কম। বেসরকারি খাতের আরও ২৮টি কোম্পানি এলপি গ্যাস আমদানি ও বাজারজাত করার জন্য সরকারি লাইসেন্স নিয়েছে।

অরুণ কর্মকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক