বিজয়নগরে লিচুর বাম্পার ফলন: প্রতিদিন বিক্রয় হয় অর্ধকোটি টাকা

বিজয়নগর, 1 June 2019, 341 বার পড়া হয়েছে,


এস এম জহিরুল আলম চৌধুরী (টিপু) :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভারত সীমান্ত ঘেঁষা উপজেলা বিজয়নগরে এ বছর লিচুর বাম্পার ফলন হওয়ায় চাষি ও বাগান মাহাজনরার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন বাজারে প্রায় অর্ধকোটি টাকার লিচু বেচা- কেনা হচ্ছে। এখানকার লিচু মিষ্টি , রসালো ও সু-স্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে এর বেশ কদরও রয়েছে। দেশের অন্যান্য জায়গায় এপ্রিল মাসের মধ্যবর্তী সময়ে লিচুর ফলন হলেও বিজয়নগর উপজেলায় মে মাসের প্রথম দিকে লিচু বাজারে আসে।
উপজেলার আউলিয়া বাজার, সিংগারবিল, হরষপুর, চান্দুরা, বিষ্ণুপুর,ছতরপুর,আজমপুর, চম্পকনগর বাজারে লিচু বিক্রি হয়। এসব বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, ফেনী ও রাজধানী ঢাকার ব্যবসায়ীরা পাইকারী দরে লিচু কিনে পিকআপ ভ্যান, সিএনজি চালিত অটো রিক্সা, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে নিয়ে যায়।
এলাকাবাসী ও লিচু চাষীরা জানায়, উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচু বাজার পাহাড়পুর ইউনিয়নের আউলিয়া বাজার। সেখানে প্রতিনিদন প্রায় ৭০ লাখ টাকার লিচু বেচা-কেনা হয়। প্রতিদিন গভীর রাতে চাষিরা ও বাগানের মাহাজনেরা লিচু নিয়ে বাজারে যায়। ভোররাত থেকে শুরু হয়ে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যেই বেচা-কেনা শেষ হয়ে যায়। উপজেলার প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে একটি করেও লিচু গাছ আছে। যাদের বাড়িতেই একটু জায়গা আছে, তারা প্রত্যেকেই বাড়িতে লিচু গাছ লাগান।
উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, খাটিংগা, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, কালাছড়া, মেরাশানী, সেজামুড়া, কামাল মোড়া, নুরপুর, হরষপুর, মুকুন্দপুর, নোয়াগাঁও, অলিপুর, চান্দপুর, কাশিনগর, ছতুরপুর, রূপা, শান্তামোড়া, কামালপুর, কচুয়ামোড়া, ভিটি দাউপুর এলাকায় রয়েছে প্রায় পাচঁ শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে দেশী লিচু, এলাচি লিচু, চায়না লিচু, পাটনাই লিচু ও বোম্বাই লিচু জন্মে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আনুমানিক ২০০৩ সালের আগে থেকে বিজয়নগর উপজেলায় লিচুর কেনা-বেচা শুরু হয়। কম শ্রমে বেশি লাভ হয় বলে ধানি জমিগুলোকেও লিচু বাগানে রূপান্তর করেছে চাষীরা। লিচু ভাল ফলায় লিচুর বাগান বিক্রি হয়। লিচু গাছে মুকুল ও গুটি আসে প্রথম দফায় স্থানীয় ও বিভিন্ন জেলার মাহাজনের কাছে গাছ বিক্রি করা হয়। গাছে মুকুল ও গুটি আসার পর দ্বিতীয় দফায় গাছ বিক্রি হয়। লিচু ছোট আকার ধারণ করলে তৃতীয় দফায় বিক্রি হয়। লিচু বড় আকার ধারণ করলে চতুর্থ দফায় বিক্রি হয়। তবে সব চাষিরা গাছ বিক্রি করেন।

গতকাল রবিবার মধ্য ভোররাত থেকে সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত বিজয়নগর উপজেলার আউলিয়া বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গভীর রাত হলেও বাজারে চাষীদের ভীড় ছিল লক্ষ্যনীয়। সময় বাড়ার সাথে সাথে লিচু চাষিদের আগমনও বাড়তে থাকে। চাষিদের কেউ কেউ কাঁধে বোঝাই করে আবার কেউ কেউ মাথায় করে লিচু নিয়ে বাজারে আসছেন। বাজারে প্রতি হাজার দেশী লিচু এক হাজার পাচঁশত টাকা থেকে দুই হাজার দুইশ টাকা, প্রতি হাজার এলাচি ও চায়না লিচু দুই হাজার টাকা থেকে তিন হাজার টাকা, পাটনাই ও বোম্বাই লিচু দুই হাজার ছয়শত থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কামালমুড়া এলাকার লিচু চাষি শফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, তার দুইটা বাগানে ৮০ -৯০টি লিচু গাছ আছে। দশ-বার দিন ধরে আউলিয়া বাজারে এসে লিচু বিক্রি করছেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় দুই লাখ টাকার লিছু বিক্রি করেছেন। সোলমান মিয়া, ফারুক ইসলাম, কাউছার মিয়াসহ উপজেলার একাধিক লিচু চাষীরা জানায়, তাদের প্রত্যেকেই এ পর্যন্ত দুই লাখ টাকা করে লিচু বিক্রি করেছেন। লিচুর বাম্পার ফলন ও বিক্রিতে তারা সন্তুষ্ট কিন্তু রমজান মাস হওয়ায় দামটা একটু কম ঈদের পর বাজার ভাল হবে দামও বেশি হবে তারা আরও জানান, বাগানে যে পরিমান লিচু আছে তাতে আরও ২০-২৫ দিন বাজারে আসতে পারবেন তারা।

মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা লিচু ব্যবসায়ী অভি রায় জানায়, সাত দিন ধরে তিনি এ বাজারে আসছেন। প্রতিদিন তিনি গড়ে প্রায় লাখ টাকার লিচু কিনেন। এখানকার লিচু অনেক ভালো ও মিষ্টি হওয়ায় লাভ করতে পারি। তাইতো এ বাজারে লিচু কিনতে আসেন বলে জানান তিনি।

ওলিপুর গ্রামের লিচু চাষী লুতফুর রহমান, সেজামোড়া গ্রামের কাউছার মিয়াসহ একাধিক চাষী জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে তাদেরকে কোন প্রকার সহযোগিতা করা হয় না। এমনকি পোকা নিধনের জন্য কোন প্রকারের বিষও সরবরাহ করা হয়না। তারা কৃষি অধিদপ্তরের সহযোগিতা ছাড়াই নিজের প্রচেষ্টায় লিচুর চাষ করে যাচ্ছেন।

ভিটিদাউদপুর গ্রামের লিচু চাষী সোলমান মিয়া বলেন, এলাকার যারা ছোট ব্যাবসায়ী আছে তারা আমাদের কাছ থেকে কম দামে কিনে বড় ব্যাবসায়ীদের লিচু কিনে দেওয়ার ফলে বড় ব্যবসায়ীরা বাজারে না যেয়েই লিচু কিনতে পারছে তাই আগের মত লিচু চাষীদের ভাল দাম পাওয়া যায় না যেমন গতবছর যে ১০০ লিচু বিত্রিু করেছি ২৫০ টাকা আর এবার সেই লিচু বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায় শুধু এলাকার দালালদের জন্য । পুলিশ প্রশাসন যদি একটু তরারকি করতো তাহলে কৃষকরা দালালদের হাত থেকে রক্ষা পেত আর ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছ থেকে লিচু সরাসরি কিনতে পারত।

Leave a Reply