গামকায় ‘রিকশা দালাল’ আতঙ্কে বিদেশগামীরা

ঢাকা, 12 March 2019, 828 বার পড়া হয়েছে,


গামকা থেকে ফিরে মো: আল-মামুন খান:

দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে মেডিকেল চেকআপের জন্য পেলেন গুলশানের সায়মন মেডিকেল সেন্টার লিমিটেডের রশিদ। গামকার দরজা থেকে বের হতেই তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করলেন হালিম নামের এক রিকশাওয়ালা। ওই হাসপাতালের আরও একজন রয়েছে জানিয়ে ওঠালেন আল আমিনকে।

দুই ঘণ্টা পর দেখা গেল আল-আমিন গামকার সামনে হাউমাউ করে কাঁদছেন। কান্নার কারণ কী জিজ্ঞেস করলে আমিন বাংলানিউজকে জানান, সায়মন মেডিকেলের কথা বলে হালিম তাকে নিয়ে গেছে পালস মেডিকেল সেন্টার লিমিটেডে। হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে তার সব টাকা।

গামকা’য় বিদেশ যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিরা মেডিকেল চেকআপ করতে এসে প্রতিনিয়ত এভাবেই পড়ছেন রিকশা দালালের খপ্পরে। আমিন জানান, রিকসায় আমার সাথে কাগজ হাতে আরও একজনকে উঠানো হয়। হালিম সায়মনে না গিয়ে আমাকে নেয় পালস মেডিকেলে।
 
তিনি জানান, সেখানে গিয়ে জোর করে আমার হাতের রশিদ ও ৫ হাজার টাকা নেয়। পরে একজনকে জিজ্ঞাসা করলে বলে এটা সায়মন নয় পালস। ততক্ষণে হালিম টাকা আর রশিদ নিয়ে পালিয়ে গেছে।

তার মতো আরও কয়েকজনকেও প্রতারিত হয়ে পালস মেডিকেল সেন্টারে বসে থাকতে দেখেছেন বলে জানান তিনি। বাহরাইন যেতে ইচ্ছুক সাইফুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান,আমাকে ইন্টারন্যাশনাল হেলথ কেয়ার লিমিটেডের (আইএসসি) রশিদ দেওয়া হয়েছে।

কবির নামে এক দালাল রিকশাওয়ালা সেজে আমাকে মক্কা মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আইএসসিতে চেকআপ করাই। নিজ শালাকে নিয়ে মেডিকেল চেকআপ করতে গামকায় আসা কুড়িগ্রামের সুরুজ মিয়াও জানালেন একই কথা। ২ বছর আগে তিনি নিজেও প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন।

তিনি বলেন, আবুধাবি যাওয়ার সময় চেকআপ করাতে এসে আমিও রিকশাওয়ালা এক দালালের খপ্পরে পড়ি। গামকা’র সামনে এরকম ২০-২৫ জনের একটি চক্র রয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী বা গামকা কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয় না। নতুন কেউ আসলেই বিপদ। বিদেশে এ ধরনের হয়রানি নেই বলেও জানান তিনি। গামকা’র সামনে কয়েকজন ভ্রাম্যমাণ চা দোকানি জানান, গামকা’র সামনে বা আশপাশে রিকশাওয়ালা সেজে বসে থাকে দালাল চক্র।

এদের হাতে গামকা’য় আসা বিদেশগামীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কেউ মেডিকেল রশিদ নিয়ে বের হলেই রশিদে থাকা হাসপাতাল বা ক্লিনিক চেনে বলে গ্রাম থেকে আসা সহজ সরল বিদেশগামীদের রিকশায় উঠিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে টাকা,পাসপোর্ট, কাগজপত্র হাতিয়ে নেয়। প্রতারিত কেউ এসে প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদের হাতে হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হতে হয়।
 স্থানীয় কয়েকজন নেতা ও গামকা অনুমোদিত হাসপাতাল মালিকদের যোগসাজসে তারা বহু বছর ধরেই মানুষকে হয়রানি করে আসছে বলে জানান তারা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গামকা গেইট ও এর আশপাশের এলাকায় ২০-৩০টি রিকশায় রিকশাওয়ালা সেজে বসে রয়েছে দালালরা।

গামকা থেকে রশিদ নিয়ে বের হলেই টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ পাতে তারা। এদের হাত থেকে বিদেশগামীদের রক্ষা করতে গামকা’র সামনে নেই কোন পুলিশ বা গামকা কর্তৃপক্ষের লোক।

গেইটের সামনে পরিচয় গোপন করে কথা হয় রিকশা দালাল হালিম ও মিজানের সাথে। দু’জনই অস্বীকার করেন মানুষকে হয়রানির কথা। মিজান দাবি করেন, ‘নতুন যারা আসে তারা তো হাসপাতাল চেনে না। তাদের সেবা দিতে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাই। এতে দালালির কি হলো?’ যদিও গামকা কর্তৃপক্ষ গামকা’র দেওয়ালে ‘রিকশাচালক নামধারী প্রতারক থেকে সাবধান’ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রেখেছে। তবে প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা করেনি।

গামকা সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিদেশ যেতে ইচ্ছুক প্রায় ৫শ‘ মানুষ গামকা’য় আসে। দেশ অনুযায়ী ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রায় ২৬টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে মেডিকেল চেকআপের জন্য তাদের পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম ও সিলেটেও রয়েছে গামকা অফিস।

তবে এর প্রতিকার আর দালাল চক্রকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন গামকা’র জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. লাহুয়ার রহমান। তিনি জানান, গামকা’র ভেতরে দালালরা আসতে পারে না। তবে গেইটের সামনে থেকে মানুষকে হয়রানি করে। বহু চেষ্টা করেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।
 
লাহুয়ার রহমান বলেন, রিকশা দালালদের ধরতে গুলশান থাকার ওসি ও ডিবিকে বহুবার বলেছি। তারা কোন ব্যবস্থা নেয় না। কোনো সহায়তাও দেয় না। আইন অনুযায়ী গেইটের বাইরে তাদের ধরার বিধান না থাকলেও অনেককে ধরে পুলিশে দিয়েছি, কয়েকদিন পর ছাড়া পেয়ে আবারও হয়রানি শুরু করে। এসব দালাল নিয়ন্ত্রণে গামকা’র সামনে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর টহল ও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা কামনা করেন তিনি।

স্থানীয় কিছু নেতার কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, রিকশা দালালদের বিষয়ে গেইটে সর্তকবাণী, সিসি ক্যামেরা লাগানো হলেও আমি অসহায়।
তবে এখন থেকে গেইটের সাউন্ড বক্সে রিকশা দালালদের বিষয়ে সর্তকবাণী প্রচার করা হবে বলে জানান তিনি।