সভ্যতার সেকাল একাল

নাসিরনগর, 10 February 2019, 179074 বার পড়া হয়েছে,


মোঃ আব্দুল হান্নান,নাসিরনগর,ব্রক্ষণবাড়িয়াঃ বদলে গেছে পৃথিবী, পাল্টে গেছে দেশ।আধুনিকের কাছে ধরা খেয়ে, প্রাচীন সভ্যতা শেষ। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে আধুনিক সভ্যতার কাছে হেরে গেছে প্রাচীন সভ্যতা।প্রচীন সভ্যতার যুগে প্রবাদে ছিল মাছে ভাতে বাঙ্গালী। সেই সময়ের আরো একটি প্রচলিত প্রবাদ, পুকুর ভরা মাছ,গোয়াল ভরা গরু আর গোলা ভরা ধান।

প্রাচীন যুগের সৌখিন মানুষেরা কলের গান,টেপ,রেডিও দিয়ে গান শোনতো।পয়সা ওয়ালা বা সমাজের বৃত্তবান সৌখিনেরা এ সমস্ত ব্যবহার করতো। একবাড়িতে একটি এ সমস্ত যন্ত্র থাকলে বিকেলে পার্শ্ববর্তী ৩/৪ বাড়ির লোকজন এসে একসাথে বসে আনন্দ উপভোগ করতো। রাতে কাঞ্চনমালা ও বিভিন্ন যাত্রাপালা করে আনন্দে দিন কাটাতো। বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগে ,ঘরে ঘরে টিভি- কম্পিউটার,হাতে হাতে মোবাইল।ি টভির ডিস লাইনে ভারতীয় সিনেমা, স্টার জলসা,জি- বাংলা সহ নানা ধরনের বিনোদন।মোবাইলে ফেইস বুকের কথা কারো অজানা নয়।বর্তমান সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হল ফেইসবুক,মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট।
প্রাচীন কালে গ্রাম বাংলার প্রতিটি মুসলিম কৃষি পরিবারে দেখা যেত এমন দৃশ্য। ভোরে পাড়ার প্রতিটি মসজিদ থেকে আল্লাহু আকবর আজানের ধ্বনির সাথে সাথে বাড়ির বৌ ঝি ও বয়স্ক মহিলারা ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে তাড়াতাড়ি কুরআন শরীফ পড়ে গোয়াল ঘরে গরুর গোবর পরিস্কার করে রান্না বান্নার কাজে লেগে যেত। পুরুষরা কাঠের লাঙ্গল,বাঁশের জোয়াল আর গরু নিয়ে হালচাষ করতে চলে যেত মাঠে। হালচাষ শেষে পুরুষরা আসার পর খাওয়া দাওয়া সেরে মহিলার লেগে যেত ধানভানা আর মসলা কুটার কাজে।তখন প্রতিটি কৃষকের ঘরে থাকতো ধানবানার গাইল চেকাইট ডেঁকি আর মসলা কুঁটার বড় বড় পাটা পুঁতা।মহিলারা সাংসারিক কাজ শেষে বহুদুর পায়ে হেটে অন্যের বাড়ি থেকে কলসি ভরে কাকে করে পানি নিয়ে আসত। দুই তিন বাড়ি পর পর দেখা যেত টিউবওয়েল। আর এখন প্রতি বাড়ি বা ঘরে ঘরে রয়েছে টিউবওয়েল।
বর্তমান আধুনিক সভ্যতার যুগে পুরোনো সব কিছু হারিয়ে গেছে। এসবের পরিবর্তে এখন দখল করে নিয়েছে নতুন নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি।কাঁঠের লাঙ্গলের বদলে কলের লাঙ্গল,পাঠা পুঁতা,ডেঁকি আর গ্রামীণ গাইল চেকাইট ও মসলা ভাঙ্গানোর জায়গা দখল করে নিয়েছে নানা রকম আধুনিক যন্ত্রপাতি আর মেশিনে। প্রাচীন যুগের মৃৎশিল্প যেমন মাটিও বাঁশ বেতের তৈরী হাড়িপাতিল,থালা বাসন বিভিন্ন রং বেরংয়ের নকশা করা ফুলদানীর জায়গা বর্তমানে দখল করে নিয়েছে প্লাষ্টিকের তৈরী জিনিস পত্রে।
প্রাচীন কালে প্রতিটি কৃষকের ঘরে থাকতো ষাঁড়,বলদ,দুধাল গাভী বাছুর সহ একাদিক গরু। প্রতিদিন সকালে কৃষকের গরু জোট বেঁধে চলে যেত হাওড়ে।সারা দিন ঘাস খেয়ে সন্ধ্যা আবার দল বেঁধে ফিরে আসতো কৃষকের ঘরে।হাওড়ে এ সমস্ত গরুর পাল দেখার জন্য প্রতিটি দলে থাকতো একজন করে রাখাল।কৃষক গরু দিয়ে হালচাষ,ধান মাড়াই করতো আর গাভীর পুষ্টিকর বিশুদ্ব দুধ পান করতো পরিবারের সবাই তাছাড়াও গরুর গোবর থেকে কৃষাণীরা চটা,মুইট্টা ঘৈ ইত্যাদি তৈরী করে তা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতো।তাছাড়াও গরুর গোবর জমির উবর্রা শক্তি বৃদ্বিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা হত।গ্রাম বাংলার এমন নয়নাবিরাম দৃশ্য এখন আর চোখ পড়ে না।কালের আবর্তে আধুনিক সভ্যতার ছোঁবলে পড়ে হারিয়ে গেছে গ্রাম বাংলার নয়নভরা এই প্রাকৃতিক দৃশ্য!

বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি ও আধুনিক সভ্যতার যুগে গ্রামের আর আগের দৃশ্য দেখা যায়না।এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে টিভি,ডিস লাইনে বৌ ঝিদের ভারতীয় সিনেমা জি বাংলা,স্টার জলসা সহ নানা ধরনের ছায়া ছবি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে, ছোট ছোট ছেলে মেয়ে সহ বৌ ঝিদের হাতে দামী দামী এনড্রয়েড বা টাস মোবাইল সেটে ফেইসবুক শোভা পাচ্ছে।

প্রাচীন যুগে খেলাধুলার মাঝে ছিল হা ডু ডু,গোল্লাছুট,বৌছি,কানামাছি,দাড়ি বান্দা ,ফুটবল ইত্যাদি।বিকেল বেলা গ্রামের ছেলে মেয়ের একসাথে খেলতো।আর বর্তমানে প্রধান ও জনপ্রিয় খেলা হল ক্রিকেট।

প্রাচীন যুগের মহিলা ও মা ঝিয়েরা কোন কারনে বাড়ির বাহিরে যেতে হলে শাড়ী কাপড় পড়ে ঘুমটা টেনে,বোকরা পরে,আলাদা ওড়না ব্যাবহার করে আবার মাথার উপড় ছাতা দিয়ে রাস্তার নীচ দিয়ে চলাফেরা করতো।আর এখনকার সময়ের মা বোনদের চলাফেরা কারো জানার বাহিরে নয়।এখন মা বোনদের দখল করে নিয়েছে আধুনিক বাহারী রকমের পোশাকে।

আধুনিক সভ্যতার যুগে সন্ধ্যার পরে গ্রামের সাধারন কৃষি পরিবারের প্রতিটি ঘরে মিটমিট করে জ্বলতো কেরোসিন তেলের কুপি বাতি আর বৃত্তবানদের ঘরে জ্বলতো হারিকেন।রাত ৯ টার পরে সমস্ত গ্রাম জুড়ে বয়ে চলতো ভুতুরে অন্ধকার।রাতেকোন কারনে কেউ একবাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাতায়াত করতে গেলে টচ লাইটের মিটিমিটি আলোতে যাতায়াত করতো। আর এখন গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলোর পাশাপাশি ঘরবাড়ি সহ বিভিন্ন রাস্তাঘাটেও শোভা পাচ্ছে সৌর বিদ্যুতের আলো।প্রাচীন সভ্যতার আরো অনেক স্মৃতিই মনে ধুলা দিয়ে চলেছে।