আমরা প্রবাসী বাংলাদেশি

প্রবাস-পরবাস, 10 February 2019, 273 বার পড়া হয়েছে,


জন্মের শুরুতে মানবজাতি কর্ম, শিক্ষা এবং ভ্রমণের কারণে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যায়। যাওয়া আসা বা ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে কর্মের সঙ্গে নতুন কিছু দেখা এবং উপলদ্ধি করাই মানব জাতির মূল লক্ষ্য। এবং তা থেকে নতুন কিছু শেখা এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসা নিজ দেশে চলছে এমনটি যুগযুগ ধরে।

যে জাতি যত উন্নত সে জাতি ভ্রমণ করে তত বেশি। যেমন সুইডিস জাতি ভ্রমণ করতে এবং নতুনত্বের সঙ্গে পরিচিত হতে পছন্দ করে। এদের সাধারণ জ্ঞান বেশ উন্নত বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে। জনবসতির দিক দিয়ে তুলনা করলে ছোট দেশ, তবে পৃথিবীর সব দেশের মানুষের বসতি রয়েছে এখানে। বাংলাদেশ নানা কারণে বেশ দেরিতে বিদেশ ভ্রমণসহ কর্ম বা শিক্ষায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায়। তবে বিদেশ ভ্রমণে না গেলেও কর্ম এবং উচ্চ শিক্ষার্থে বর্তমানে অনেকেই বিদেশে আসছে। দুঃখের বিষয় এই যে, বেশির ভাগ বাংলাদেশী দূরপরবাসে অধিক পরিশ্রমের কাজগুলো কম বেতনে করছে। কঠিন জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে হলেও বেকারত্ব এবং গোটা পরিবারের ভরণ পোষনের কারণে তারা বছরের পর বছর বিদেশে বসবাস করছে। আমি আমার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে যে সমস্থ দেশ ঘুরেছি তার মধ্যে সর্বত্রই বাংলাদেশিদের দেখেছি।

তবে মধ্যপ্রাচ্য, সাউথ এশিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশে নানা পেশাতে এরা নিয়োজিত আছে। যে সমস্ত বাংলাদেশি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে আছে, স্থায়ীভাবে বসবাস করছে এবং বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে, তারা নানাভাবে সাহায্য করছে যারা অবৈধভাবে বিদেশে আছে তাদেরকে।

প্রসঙ্গত বলতে হয়, বাংলাদেশিরা তুলনামূলকভাবে পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, শ্রীলংকা, বার্মা বা আরো অনেক দেশের তুলনায় শিক্ষায় এবং কর্মে ভালো হওয়া সত্বেও বিদেশে কম বেতনে কাজ করছে। অথচ বিদেশে আসতে এদের দুই থেকে তিনগুন বেশি অর্থ এবং নানা ধরণের বাঁধাবিঘ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে বিশেষ করে যারা এর দায়িত্বে রয়েছে।

কিন্তু তেমন কোন আশাব্যঞ্জক ফলাফল এখনও নজরে পড়ছে না। পারিবো না এ কথাটি বলিও না আর, কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার, পারো কি না পারো করো যতন আবার। একবার না পারিলে দেখো শতবার। পারিবে না বলে মুখ করিও না ভার, ও কথাটি মুখে যেন না শুনি তোমার।

আমি জানি হয়তো শতবার লেখা হয়েছে এ বিষয়টি নিয়ে কিন্তু সমাধাণ এখনও হয়নি। তাই আবার নতুন করে হাজির হলাম দেশবাসীর কাছে। এ বছর কয়েকটি দেশ ভ্রমণে আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি নানা বিষয়ে। আমাকে সবাই বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে যেন আমি কিছু লিখি বাংলাদেশ বিমানবন্দরে যে দুর্ব্যবহার প্রবাসীদের উপর করা হয় এবং ব্যাগ কেটে জিনিসপত্র নেয়া হয় এর ওপর। কথা দিয়ে কথা রাখতে পারব কি পারব না! তার পর আমি নিজেও দূরপরবাসে বসবাস করি, কিভাবে কি করবো! যেহেতু লেখালিখি করি তাই তাদের অনুরোধ ছিল কিছু যেন লিখি। যে সব বাংলাদেশি আজ বিদেশে, এদের বেশির ভাগ পরিবারই দেশে থাকে। তাই এদের পুরো উপার্জিত অর্থই এরা দেশে পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশে যে পরিমান বৈদেশিক অর্থ আসছে তার বেশিরভাগই এ দূরপরবাসীদের কারণে।

যারা দেশের বাইরে কঠিন কাজ করছে এদের শিক্ষাগতমান খুব যে কম তাও বল্লে ঠিক হবে না তুলনা করলে যারা দেশে নানা কর্মের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এদের পেশাতে বেশির ভাগই বছরে একবার এক মাস ছুটি পেয়ে থাকে এবং তখন তারা তাদের পরিবারের জন্য কিছু ভালোমন্দ কেনাকাটা করে। দেশে যখন আসে তাদের বুকভরা আশা আর ভালোবাসার সঙ্গে ছোটখাটো কিছু প্রেজেন্ট নিয়ে তারা দেশে ল্যান্ড করতেই বিমানবন্দরে তা চুরি হয়।

বিমানবন্দরে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, কাস্টমস সিকিউরিটি। তারপরেও এসব ঘটনা ঘটে। ডিজিটাল যুগে ক্যামেরা পর্যন্ত রয়েছে। তাই কোথাও ফাঁকি দেয়ার কোন স্কোপ থাকার কথা নয়, তারপরও চুরি হচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবার কথা জনগনের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া।

অথচ তারা নিজেরাই যদি দায়িত্ব অবহেলা করে তাহলে কাদের ওপর আমরা আস্থা রাখবো! যারা কঠিন পরিশ্রম করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে তাদেরকে স্বাগতম জানানোর কথা, তা না করে তাদের ওপর দুর্ব্যবহার করা থেকে শুরু করে যে হয়রানি করা হয় তা সত্যি দু:খজনক। দুর্নীতি, চুরি, খাবারে বিষ মেশানো, ভেজাল দেয়া থেকে শুরু করে লুটপাট বা ডাকাতি সবই চলছে দেশে দেদারছে।

এ ধরণের অন্যায় কেউ করছে কলমে, কেউ ক্ষমতায়, কেউ দুর্নীতির মাধ্যমে কেউ চুরি বা ডাকাতির মধ্য দিয়ে। সবাই সবার থেকে ফাঁকি দেয়ার মনোভাব নিয়ে জীবন যাপন করছে। যারা কোনভাবেই অন্যায় করার সুযোগ পাচ্ছে না, কি অবস্থা তাদের বা কেমন আছে তারা? মনে হচ্ছে সৎ পথে চলা একটি কঠিন চালেঞ্জ বাংলাদেশে বসবাসরত মানুষের জন্য।

উপরের বর্ণনায় সবাই বলবে যে এটা অন্যায় তারপরও আমরা এর প্রতিকার করার জন্য তেমন আশাব্যঞ্জক কিছু দেখছি না। কিন্তু কেন? দুঃখের বিষয় বাংলাদেশ যেমন পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি গরীব দেশ, আবার অনেক ধনী দেশের মত বড়লোকের সংখ্যাও রয়েছে এখানে প্রচুর।

এমন একটি মিশ্রণের সমন্বয়ে যে দেশ সেখানে ভালোবাসা, দুর্নীতি, মায়ামমতা বা ঘৃনার পার্থক্য রয়েছে বিশাল আকারে। কারণ ধনী এবং দরিদ্রের মধ্য বড় ব্যবধান তাই। সোস্যাল মিডিয়াতে চোখ বোলালে দেখা যায় চাকুরি করে কেরানীর অথচ হয়েছে কোটিপতি। এতে বেশ পরিস্কার যে দুর্নীতি এর মূলে কাজ করেছে।

অতএব ধরা যেতে পারে এটা স্বাভাবিক যে প্রবাসীদের মালামাল লুট করা থেকে শুরু করে তাদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে বা গরিবের রক্ত শোষণ করে এক ধরণের লোক সমাজে প্রাসাদ গড়ে তুলছে। আমরা এসব বিষয় অবগত কিন্তু তারপরও কিছু করছিনা বা তেমন চেষ্টাও নেয়া হচ্ছে না কতৃপক্ষের থেকে। কারণ কি থাকতে পারে? প্রশাসন কি তাহলে এর জন্য দায়ী?

ইদানিং সব কিছুতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জড়িত করা দেশের সকলের একটি অভ্যাস হয়ে দাড়িয়েছে। এখন যদি সবই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে করতে হয়, কি দরকার আছে তাহলে সারাদেশে প্রশাসক নিয়োগ করে রাখা? প্রশাসন যদি প্রয়োজনে কাজে না আসে তাহলে কি দরকার আছে তা রাখার বা থাকার!

শুনে আরো দু:খ পেয়েছি যে প্রবাসে তাদের নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেনা বাংলাদেশি দূতাবাস। তাদের বিপদেও অনেক সময় তারা পাশে পায়না বাংলাদেশি দূতাবাসকে।

কেমন হবে যদি সব বাংলাদেশি প্রবাসী বিদেশ ছেড়ে দেশে চলে আসে? যে সুযোগ সুবিধা বাংলাদেশ পাচ্ছে প্রবাসীদের মাধ্যমে তা বন্ধ হবে। একই সঙ্গে তারা দেশে এসে বেকারত্ব বাড়াবে এবং সেই সঙ্গে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।

জাতির সামনের দিকে এগিয়ে যাবার যে প্রবণতা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে তাও ক্ষুন্ন হবে। তাই সবার উচিত হবে যারা দূরপরবাসে কাজ করে বিদেশী অর্থ দেশে আনছে তাদের প্রতি ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা দেখানো।

একই সঙ্গে যারা বিদেশে দেশের অর্থ পাচার করছে তাদেরকে ঘৃণা করা শিখতে হবে দেশের স্বার্থে। আমরা যারা প্রবাসে বসবাস করছি আমাদের কাজ, আচরণ, সততা এবং দায়ীত্ববোধ যেন কোন ভাবেই আমাদের দেশের প্রতি যে গুঁড উইল রয়েছে তা নষ্ট না করে, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের লাল সবুজ পাসপোর্টের উপর যেন কালো দাগ না পড়ে এবং কোন অবস্থাতেই যেন বাংলাদেশের বদনাম না হয়। আমরা যেন এমন কিছু না করি বা কেও ভুল বসতো কিছু করলে তাকে যেন সঠিক পথে ফিরিয়ে আনি। আর একটি বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো যেকোন কাজে যেখানেই যাক না কেন, সেই দেশের ওপর, কাজের ওপর এবং সেই দেশের রীতিনীতির ওপর কিছুটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। যাতে করে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

মনে রাখতে হবে যে আমাদের দৈনন্দিন কাজের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। সর্বোপরি প্রবাসীদের কঠিন জীবনকে আর কঠিন না করে বরং তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। ঘৃণা নয়, প্রীতি ও প্রেমের পূর্ণবাঁধনে দূরপরবাসে থাকতে চাই।